1. dipanchalbarguna@gmail.com : dipanchalAd :
সহিংসতাজনিত ঘটনা উল্ল্যেখযোগ্য হারে হ্রাস করায় করনীয় - dipanchalnews
মঙ্গলবার, ০৯ অগাস্ট ২০২২, ০২:০৪ অপরাহ্ন

সহিংসতাজনিত ঘটনা উল্ল্যেখযোগ্য হারে হ্রাস করায় করনীয়

  • আপলোডের সময় : বুধবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০২১
  • ১২১ বার নিউজটি দেখা হয়েছে

মারিয়া আক্তার, ফেলো, লোকবেতার : রাত তখন ১২ টা ঘুমতে যাবো, হঠাৎ ফোন আসে রেনু (রুপক নাম) আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছিলো। ফোনটা রেখে দিয়ে নিজেও একটু অবাক হই ফেইসবুকে যেয়ে রেনুকে এক্টিভ দেখে ম্যাসেজ করলাম কি হয়েছে তোর পাগলামি শুরু করেছিস কেনো। তখন ও আমায় একটি স্কিনশট দেয় যেখানে কথপকথন ছিলো রেনু এবং আমাদের কলেজ শিক্ষকের। রেনুর দেয়া শিক্ষকের কথপকথনগুলো অনেকটা এমন ছিলো- “তুমি তো আজকাল এদিকে আসো না ভুলে গেছো আমায়। কিন্তু আমার তোমাকে মনে পরে খুব। তোমার আন্টি কাল বাসায় থাকবে না তুমি এসো তেfমায় একটু দেখবো। দরকার হলে আমি তোমায় গাড়ি ভাড়া বিকাশে পাঠিয়ে দিচ্ছি, বিকাশ নাম্বার দাও। তোমাকে ভুলতেই পারিনা আমি। তুমি তো এসে তোমার বান্ধবীদের সাথে দেখা করে চলে যাও।”

পাঠক অবাক হলেন? আমিও অবাক হয়ে ছিলাম যে শিক্ষককে বাবার মত সম্মান করি সে শিক্ষক এমন প্রস্তাব দিলে ঐ ছাত্রীর কেমন লাগবে আশা করি বুঝতেই পারছেন। যার ফলে রেনু মানসিকভাবে ভেঙে পরে কারণ এটা ওর ভাবনারও বাহিরে ছিলো। পাশাপাশি কোভিড-১৯ এর ফলে রেনুকে পুরোটা সময় বাড়িতেই থাকতে হচ্ছে। ফলে রেনুর বিয়ে হয়না কেন এ নিয়ে গ্রামের মানুষের নানান ধরণের কথা শুনে ওর মা প্রতিদিনই কথা শুনায়, যেটা রেনুকে মানসিকভাবে ভেঙে দিচ্ছিলো।

এ পরিস্থিতে যদি আপনি থাকতেন আপনিও বোধ হয় ভেঙে পড়তেন মানসিকভাবে।

পাঠক এই গল্পে দুটো দিক খুব বেশি করে পরিলক্ষিত হচ্ছে ১. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা সোস্যাল মিডিয়ার নেতিবাচক প্রভাব এবং পারিবারিক সহিংসতা। যা রেনুকে প্রতিনিয়ত মানসিক চাপ দিয়ে যাচ্ছিলো এবং এই মানসিক চাপের ফলেই রেনু আত্মহত্যার মত পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়। রেনু নিজেকে কোথাও সুরক্ষিত মনে করছিলো না যেখানে রক্ষকই ভক্ষক সেখানে নিজেকে কি করে সুরক্ষিত রাখবে সে। এর পর সমাজের নানান কথা তো রয়েছেই।

পাঠক আপনার কাছে প্রশ্ন রেখে গেলাম রেনুর সাথে যা ঘটেছে এটা উচিত না অনুচিত?

হ্যাঁ উত্তর হিসেবে হয়তো বলবেন অনুচিত। তবে আমাদের সমাজে এখনও কিছু মানুষ রয়েছে যারা এখানেও রেনুকেই দোষারোপ করবে। কারণ এটাই আমাদের সমাজের একটা অসুখে পরিণত হয়েছে।

পরিবার হোক বা রাস্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা কর্মস্থল প্রতিটি স্থানেই কোনো না কোন নারী বা শিশু কোন একভাবে সহিংসতার শিকার হবেই। বাংলাদেশে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা যেন এক নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে।

আর এর কারণ হিসেবে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবকেই বেশি বলা হয়েছে। জন্ম থেকেই কন্যা শিশুরা বৈষম্যের শিকার, আর বৈষম্য থেকেই সহিংসতাজনিত ঘটনার প্রাদুর্ভাব ঘটে।

ইউএনউইমেন এর তথ্য অনুসারে বিশ্বে প্রতি তিনজন নারীর একজনকে শারীরিক অথবা যৌন সহিংসতার শিকার হতে হয়েছে যার বেশিরভাগই নিকটতম সঙ্গীর দ্বারা এবং প্রতিদিন ১৩৭ জন নারী তাদের পরিবারের সদস্যদের দ্বারা হত্যার শিকার হয়। মোট ৩৫ শতাংশ নারী তাদের জীবনের কোনো না কোন সময় তাদের নিকটতম সঙ্গীর দ্বারা এবং যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে।

মহামারি কভিড-১৯ সময়ে সহিংসতাজনিত ঘটনা অতিমাত্রায় বেড়েছে যার প্রভাবে শিশু এবং নারী মানসিকভাবেও ভেঙে পড়ছে। আর সেই সাথে বারছে শিশু এবং নারী মৃত্যু হার।

ইউএন উইমেনের কোভিড-১৯ সময়ে বাংলাদেশের রেপিড জেন্ডার এনালাইসিস (আরজিএ) প্রতিবেদনে বলা হয় লকডাউনে জীবিকার সুযোগ হারানোর ফলে নিজেদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তাকে একটি ইস্যু বলে জানিয়েছে ৪৯.২ শতাংশ নারী ও কন্যা শিশু। সহিংসতার শিকার হলে কোথায় অভিযোগ করতে হবে তা জানে না ৩৩শতাংশ নারী।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে মোকাবেলার উপর জরিপ চালায়। সাক্ষাৎকার নেয়া নারী ও শিশুদের মধ্যে ৯,৮৪৪ জন নারী এবং ২৮৬ জন শিশু জানিয়েছে যে তারা সহিংসতা জনিত ঘটনার শিকার হয়েছে।

গণমাধ্যমের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে কোভিড ১৯ মহামারির সময়ে বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে চারজন নারী ধর্ষনের শিকার হচ্ছে।

গত ২৯/১১/২১ তারিখে বরগুনা জেলায় নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে একটি সংলাপের আয়োজন করে কমিউনিটি রেডিও লোকবেতার। যেখানে সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যাক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। এ সংলাপে নারীর প্রতি সহিংসতা কেন হয়, সহিংসতার কারণ এবং উত্তরনের উপায় সম্পর্কে আলোচনা হয়।

সকলের অভিব্যাক্তিতে সহিংসতার কারণ হিসেবে পরিবারকেই নির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে। অনেকেরই ভাষ্যমতে নারীদের মাঝে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের ফলে সন্তান জন্ম থেকেই বৈষম্যের শিকার হয়। যার প্রভাব ঐ সন্তান এবং সমাজের উপর পড়ে ফলে পারিবারিক সহিংসতাটাও বেশি হয়। যা কোভিড-১৯ সময়ে আরো বেড়েছে। শিশু বা নারী সকলেই পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছে পাশাপাশি বেড়েছে ধর্ষন, সাইবার বুলিং এর মত ঘৃণ্যসব কার্যক্রম।

কমিউনিটি সংলাপে উপস্থিত জাগোনারীর কমিউনিকেশন সাইডে কাজ করা ডিউক ইবনে আমিন বলেন বর্তমানে সোস্যাল মিডিয়ায় সহিংসতার শিকার হচ্ছে নারীরা বেশি। যেখানে নারীদেরকে ব্লাকমেইলের শিকার হতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বরগুনা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি চিত্তরঞ্জন শীল বলেন কোভিড-১৯ তেত্রিশবারের মত রূপ বদল করেছে সেক্ষেত্রে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা কতবার যে রূপ পাল্টাচ্ছে তার কোনো সঠিক হিসেব নেই। যা এখন রূপ পরিবর্তন করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের রূপ নিয়েছে।

এ ক্ষেত্রে করণীয় হিসেবে সকলে বলেন পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব নারীর থেকে দূর করতে হবে। পরিবার বড় পাঠশালা সেখান থেকেই আগে নারীকে সামাজিক ধারণা দিতে হবে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা আরও বৃদ্ধি করতে হবে।

পাথরঘাটা উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ফাতিমা পারভিন জানান নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার জন্য দায়ী আমরা, আমাদের সমাজ এবং রাষ্ট্র। বিচার দীর্ঘতম হওয়ায় নারীরা বিচার পেতেও যায়না অনেকে মুখ ফুটে বলতেও পারেনা কারণ সে কোথাও নিজেকে সুরক্ষিত মনে করে না। তিনি আরও বলেন ছেলে-মেয়েদের নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে।

এ সংলাপে উপস্থিত হোসনেয়ারা চম্পা বলেন প্রত্যেক মা যদি সচেতন থাকতো তাহলে হয়তো সহিংসতা কিছুটা হলেও কমে আসতো। আধুনিকতার প্রভাব এবং মোবাইল ফোনের জন্য এ সমস্যা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি আরও বলেন অধিকার আমরা পেয়েছি মঞ্চে, মাইকে, বক্তব্যে তবে বাস্তবে পাইনি। আমরা সকলে যদি এগিয়ে না আসি তাহলে আমরা নারীরা এগিয়ে আসতে পারবো না কখোনোই।

এ সংলাপে উপস্থিত বরগুনা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মেহেদী হাসান বলেন সবার দায়িত্ব যদি সবাই পালন করতে পারেন তবে পুলিশ কেস কম হবে। দরকার হলে আর উচ্চ পর্যায়ে যাবেন তবু সমাধানের পর্যায়ে আসেন। আপনারা আমাদেরকে তথ্য দিন আমরা সমাধান দিবো। আর করনীয় হিসেবে আমাদের সকলকে সকলের বন্ধু হতে হবে। কারণ নারী তার কথা তাকেই বলবে যাকে সে ভরসা এবং নিজেকে সুরক্ষিত মনে করবে।

এ সংলাপে সব থেকে বেশি দুটো জিনিস বেশি উঠে আসে। তা হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অর্থাৎ সাইবার বুলিং এবং পরিবারে যেখান থেকে সহিংসতা জনিত ঘটনার সূত্রপাত ঘটে।

সকলের মতামত সাপেক্ষে বলি, নারীরা যদি নিজেরা আওয়াজ না তোলে তবে এ সমাজে কখোনো নিজের অস্তিত্ব সম্মাবের সাথে রাখতে পারবেনা এবং নারী ও শিশু মৃত্যু হার উল্লেখযোগ্য হারে কমানে যাবেনা। আমাদের সকলের আরও বেশি সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে কন্যা শিশুর প্রতি। যারা এখনও ছোট। সহিংসতাজনিত ঘটনা নারীর মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয় এবং শিশুর মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।

পাশাপাশি সকলের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। একজন শিশু বা নারীকে যদি আমরা সুযোগই না দেই তবে সে নিজেকে প্রমাণ করতে পারবে না। নিজের প্রতিভাকে সে প্রকাশ করতেও এক সময় ভয় পাবে। তাই সকলের সাথে সুন্দর ব্যবহার করতে হবে এবং শিশুর যত্নে মা বাবাকে আরও বেশি খেয়াল রাখতে হবে। কারণ একজন শিশুর পরিবারই তার প্রথম পাঠশালা। আসুন নারী ও শিশু ঝরে পড়া রোধে সকলে এগিয়ে আসি এবং সমাজকে একটি সুন্দর সু-পরিবেশ প্রদান করি।

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুণ :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এই বিভাগের আরও খবর :
© All rights reserved © 2020 The Daily Dipanchal
Customized By BlogTheme