1. dipanchalbarguna@gmail.com : dipanchalAd :
আমতলীর চাওড়া খালের পঁচা পানির দুর্গন্ধ ও সাপের উপদ্রবে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ৮০ হাজার মানুষ - dipanchalnews
বৃহস্পতিবার, ০৭ জুলাই ২০২২, ০২:০১ অপরাহ্ন

আমতলীর চাওড়া খালের পঁচা পানির দুর্গন্ধ ও সাপের উপদ্রবে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ৮০ হাজার মানুষ

  • আপলোডের সময় : শনিবার, ৩ জুলাই, ২০২১
  • ১১৪ বার নিউজটি দেখা হয়েছে
dav

জাকির হোসেন, আমতলী থেকে : ‘খালের পানি পইচ্যা গ্যাছে, গন্ধে মোরা বাড়ি থাকতে পারি না, ঘুমাইতে পারি না, চলতে পারি না, খালি গন্ধ আর গন্ধ’। হেই আর মধ্যে আবার মশা মাছি আর সাপের উৎপাত। এই ভিডা ছাইর‌্যা যাইতেও পারি না আবার গন্ধ সইতেও পারি না। মোগো অইছে মরন দশা। কথা গুলো বলছিলেন আর শরীর থেকে দিনের বেলায় মশা মারছিলেন আমতলীর তুজির ঘোজার ষাটোর্ধ বিধবা আলেয়া বেগম। আলেয়ার মত কষ্টে আছে চাওড়া খালের পারে অবস্থিত ৩০ কিলোমিটার এলাকাজুরে ২৬টি গ্রামের ৮০ হাজার মানুষ। প্রতিনিয়ত তারা পঁচা পানির দুর্গন্ধ সহ্য করে আর মশা মাছি সাপের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছে। পরিবেশ এবং প্রতিবেশের কারনে তাদের জীবন আজ বিপন্ন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আমতলীর চাওরা খাল আমতলী পৌরসভার একাংশ, আমতলী সদর, হলদিয়া এবং চাওরা ইউনিয়নের হার্ড (হৃদয়) হিসেবে চিহ্নিত। এই খালটি ৩টি ইউনিয়ন এবং আমতলী পৌরসভার মাঝ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে প্রমত্তা পায়রা নদীর সাথে মিশেছে।

এই খালের অন্ত:ত ২০টি শাখা খালের মাধ্যমে ২৬ গ্রামের প্রায় ৮০ হাজার মানুষের পানি প্রবাহ এবং জীবন জীবিকা গড়ে ওঠে। ১৯৮৩ সালে আমতলীর চাওড়া খালে পানি উন্নয়ন বোর্ড অপরিকল্পিত ভাবে একটি বাঁধ নির্মান করে। বাঁধ নির্মানের সময় বিপরীত দিকের সুবন্ধি নামক স্থান দিয়ে পানি নিষ্কাশনের জন্য খোলা রাখা হয়। এই অংশের মাধ্যমে চাওরা খালের পানি গাবুয়া এবং আগুনমুখা নদীর ওঠা নামা করত। নদীর এই খোলা অংশটিও ২০০৯ সালে আমতলী উপজেলা পরিষদের সাবেক (বরখাস্ত হওয়া ) চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন তালুকদার জবরদস্তি করে বাঁধ নির্মান করে আটকে দেয়। ফলে চাওরা খালের আমতলী এবং সুবন্ধি অংশে বাঁধ দেওয়ায় ভিতরের পানি প্রবাহ সম্পূর্ন বন্ধ হয়ে যায়। এবং পানি নিষ্কাশনের অভাবে শাখা প্রশাখাগুলো পানির অভাবে সম্পুর্ন মরে যেতে থাকে এবং অপর দিকে বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশনের অভাবে জলাবদ্ধতায় ফসল হারায় প্রায় ১৫টি গ্রামের মানুষ।

মূল চাওড়া খাল কঁচুরি পানায় ভরে মানুষের সেচকাজসহ নৌচলাচল সম্পূর্ন রুপে বন্ধ হয়ে যায়। শুরু হয় মশা মাছি এবং সাপের উপদ্রব। কচুরি পানায় খাল ভরে যাওয়ায় শুকনো মৌসুমে এই খালের পানি পঁচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। মানুষ তো দুরের কথা কোন পশু পাখিও এই পানি ব্যবহার করতে পারছে না। শুকনো মৌসুমে এই খালের পানি পচে যাওয়ায় সেচ কাজেও লাগানো যাচ্ছে না। এই খালের পঁচা পানি ব্যবহারের ফলে অনেকেরে শরীরে দগদগে ঘাঁ হয়ে গেছে। চ্দ্রা গ্রামের সবুর জান বলেন, মোরা এই খালের পানি আতে ধরতে পারি পারি না। আরি পাতিল ধুইতে পারি না। রানতে পারি পারি না। পানি আতে লাগাইলে আত চুলকাইতে চুলকাইতে ঘাও অইয়া যায়। একই গ্রামের একুব বয়াতি জানান, গরু বাছুর নাওয়াইতে এবং পাানি খাওয়াইতে পারি না। হেইয়ার লইগ্যা এহন গরু বাছুর পালা বন্ধ হইর‌্যা দিছি। উত্তর তক্তাবুনিয়া গ্রামের রামেশ্বর চন্দ্র জানান, এই হুগনা মৌসুমে পানি পইচ্যা গন্ধ আয়। পঁচা পানির গন্ধে মোরা দিনে রাইতে বাড়তে থাকতে পারি না।রামজি গ্রামের সুরাত জান বলেন, দ্যাহেন স্যার দ্যাহেন দিনের বেলায় মশা আর মাছিতে জালাইয়া লইছে। এই খালে কচুরি পানা জইম্যা মোগো গরীবের অইছে মরন দশা। পানির অভাবে ঠিক মত নাইতে পারি না, কাপর চুপর ধুইতে পারি না। এহন এই সময় মোরা এই বাপ দাদার ভিডা ছাইর‌্যা কোন হানে যাইতেও পারি না। আর এহন পানির পচা গন্ধে থাকতেও পারি না। দিনে মশায় জালায়। আর রাইতে ঘড়ে উডানে রাস্তায় সাপে জালায়। ঠিক মত আটতেও পারি না।

চাওরা খালের এই বাঁধের কারনে আমতলী পৌরসভার ৩ এবং ৭ নং ওয়ার্ডসহ আমতলী সদর ইউনিয়নের ছুরিকাটা, মহিষডাঙ্গা, নাচনা পাড়া, পূর্ব আমতলী, আড়–য়া বৈরাগী, চলাভাঙ্গা, হলদিয়া ইউনিয়নের হলদিয়া, উত্তর তক্তাবুনিয়া, গুরুদল, লক্ষী, রাওঘা, কাঠালিয়া, এমপির হাট, রামজি, চিলা, ঘুঘুমারি, সোনাউটা, দক্ষিণ তক্তাবুনিয়া এবং চাওরা ইউনিয়নের চলাভাঙ্গা, কাউনিয়া, চন্দ্রা, পাতাকাটা, তালুকদার হাট, লোদাসহ ২৬টি গ্রামের ৮০ হাজার মানুষ পড়েছে মহা বিপদে। চাওরা খাল এখন ৮০ হাজার মানুষের মরন দশায় পরিনত হয়েছে। এই খালে কচুরি পানার কারনে আরো প্রায় ১৫-২০টি শাখা নদীও মরে কচুরিপানা জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় মানুষ এখন শুকনো মৌসুমে পানি সংকটে পড়েছে মারাত্মক ভাবে। মরে যাওয়া খাল গুলো হচ্ছে, বলই বুনিয়া, হলদিয়ার কাউনিয়া, রামজির খাল, ঘুঘুমারি খাল, আড়–য়াবৈড়াগি খাল, নাচনাপাড়া খাল, চিলা খাল, ছুরিকাটা খাল, লোদা খাল, চলাভাঙ্গা খাল, পাতাকাটা খাল, লক্ষীর খাল এবং কালীগঞ্জের খাল। চাওরা খালের এই মরন দশার কারনে এখন অনেক যায়গায় দখল দুষণ হয়ে যাচ্ছে দেদারছে। এই খালের পারের অন্ত:ত ২০টি স্থানে ভূমি দসুর‌্যা দখল করে খাল ভরাট করে পাঁকা ইমারত বানিয়ে ব্যাবসা বানিজ্য করছে।

তারা আবার এই খালে ময়লা আবর্জনা ফেলে এবং খোলা পায়খানা বানিয়ে পরিবেশ দুষণ করছে অহরহ। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, তুজির ঘোজা, তালুকদার হাট, হলদিয়া, চিলা, নাচনা পাড়া, আমতলী পৌরসভার অংশের অনেক জায়গায় খাল দখল করে দোকান বানিয়ে দখল করে নিয়েছে। চাওড়া খালের এই মরন দশার কারনে জীবন জীবিকা হারিয়েছে অন্ত:ত ১০ হাজার জেলে। একসময় তারা এই খালে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতো। আজ তারা কোথায় হারিয়ে গেছে তার কোন পরিসংখ্যান নেই সরকারী দপ্তরে।উত্তর তক্তাবুনিয়া গ্রামের ফারক জানান, মোর বাপ দাদা চৌদ্দ পুরুষ এই খালে মাছ ধইর‌্যা সংসার চালাইত। মোরা এহন ঠেইক্যা এই মাছ ধরা বন্ধ কইর‌্যা অন্য কাম কইর‌্যা সংসার চালাই। চাওড়াখালের সংসকট সমাধানে ২০১৭ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড ৭শ ৫৬ কোটি টাকা ব্যায় ধরে একটি মেঘা প্রকল্প গ্রহন করে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাধমে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে দাখিল করে। এ প্রকল্পের আওতায় খাল পুন: খনন, কঁচুরি পানা পরিস্কার, ৫ ব্যান্ডের স্লুইস নির্মান করে খালের পানি প্রবাহের গতি ফিরিয়ে আনা। কিন্ত ৪বছর অতিবাহিত হলেও সে প্রকল্প আর আলোর মুখ দেখেনি। স্থানীয় পরিবেশ কর্মী ও বেসরকারী সংগঠন এনএসএস এর (নজরুল স্মৃতি সংসদ) নির্বাহী পরিচালক শাহাবুদ্দিন পান্না জানান, চাওড়া খালের সমস্যা সমাধানের জন্য সুবন্ধি বাঁধ কেটে পানি প্রবাহ সচল করলে চাওরা খাল আবার তার প্রান ফিরে পাবে। বেলা (বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি) বরিশালের সমন্বয়কারী লিংকন বায়েন বলেন, চাওড়া খালের সমস্যার কারনে ওই অঞ্চলের হাজাজার হাজার মানুষ নিত্য দিনকার ব্যবহারযোগ্য পানি সমস্যায় ভূগছে। অপরিকল্পিত বাঁধের কারনে এই খালের পারে বসবাস রত ২৬ টি গ্রামের প্রায় ৮০ হাজার মানুষ আজ চরম ভোগান্তিতে পরেছে। চাওরা খালের এই বাঁধ এখন তাদের গলার কাঁটা হয়ে দাড়িয়েছে। এই খালের পানি প্রবাহ নিশ্চিত করতে সঠিক প্রকল্প গ্রহন এখন জরুরী হয়ে পড়েছে।

বরগুনার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী কায়সার আলম জানান, চাওড়া খালের কঁচুরি পনা অপসারন করে খনননের মাধ্যমে পানি প্রবাহ নিশ্চি করা এবং সকল ধরনের সমস্যা সমাধানের জন্য ৭শ ৫৬ কোটি টাকার একটি মেঘা প্রকল্ড গ্রহন করে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বরগুনার জেলা প্রশাসক মো. হাবিবুর রহমান জানান, চাওড়া খালের পানি প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য যা করা প্রয়োজন এজন্য সকল ধরনের পদক্ষেপ গ্রহন করা হবে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুণ :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এই বিভাগের আরও খবর :
© All rights reserved © 2020 The Daily Dipanchal
Customized By BlogTheme