1. dipanchalbarguna@gmail.com : dipanchalAd :
স্বাস্থ্যবিধির প্রথম বন্দি (রম্য গল্প) - dipanchalnews
রবিবার, ০৩ জুলাই ২০২২, ০২:২৬ অপরাহ্ন

স্বাস্থ্যবিধির প্রথম বন্দি (রম্য গল্প)

  • আপলোডের সময় : বুধবার, ৩ জুন, ২০২০
  • ৩২২ বার নিউজটি দেখা হয়েছে

মাহবুব হাসান জুয়েল :
বাড়িতে বৃদ্ধ মা। অসুস্থ। বিশ্বে কোভিড-১৯ মহামারি ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষ এই ভাইরাসের প্রতিকার জানে না। একেবারে নতুন এক রোগ। তাই ঘরে থাকাই নিরাপদ মনে করে স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীরা। এই যে মানুষের চলাফেরা, যাতায়াত বন্ধ – একে বলে লকডাউন। বিশ্বজুড়ে লকডাউন চলছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে যাওয়া বারণ। সবাই গৃহবন্দি।

দীর্ঘ গৃহবন্দিকালে পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। কিন্তু বসে খেলে রাজার গোলাও ফুরিয়ে যায়। কচ্ছোপের খোলসে ঢোকার মতো দেশের আর্থ-সামাজিক জীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। তাই ঝুঁকি নিয়েই সরকার কিছু প্রতিষ্ঠান গণপরিবহন ইত্যাদি চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ৩১ মে থেকে সীমিত পরিসরে সব ধরণের যান চলবে। জীবিকার কাছে হার মানতে যাচ্ছে জীবন।

জরুরি কাজে ঢাকা এসে আটকে গেছেন সুজন দুমাসের বেশি হতে চলল। অনাগত দিনে কী হয় জানা নাই। প্রথম দিনই যাত্রা করা ভালো। ৩০ বছরের এক তরুন। এ দেশের দেশাচার তার কিছুটা আত্মস্থ হয়েছে। করোনা একটি সংক্রামক ব্যাধি। তাই ঝুঁকি কমাতে গণপরিবহনে স্বাস্থ্য বিধি মানার যে সকল শর্ত দেয়া হয়েছে, তা প্রথম দিন খুব ঘটা করেই পালিত হবে বলে তার বিশ্বাস।

ভোর ছয়টায় গাবতলি থেকে পংখীরাজ পরিবহনের গাড়ি ছাড়বে। মাওয়া হয়ে বরগুনা। ভোর চারটায় কাউন্টারে উপস্থিত হয়েছে সুজন। কাউন্টার থেকে বলা হলো, আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর যাত্রী টিকিট দেয়া হবে। নেতা আসবেন উদ্বোধন করতে।

আলো বাড়ার সাথে সাথে সাংবাদিকবৃন্দ আসছেন, নেতা-কর্মীরা আসছেন। যাত্রীরা আসছেন। তবে স্পষ্ট পার্থক্য করা যায়। যারা একটু শান্ত, উদ্বিগ্ন; তারা যাত্রী। যারা বেশ উৎফুল্ল, বারবার হ্যান্ডশেক করছেন; লাইনে চলার সময় যেমন প্রত্যেকটা পিঁপড়ে বিপরীত দিক থেকে আসা পিঁপড়ের সাথে মুখে মুখ মিলায় তেমন করছেন যারা, তারা রাজনীতিক। কিছু লোক না যাত্রী, না রাজনীতিক। তবে সচেতন দর্শক গোছের। কেউ কেউ সামান্য তাফালিং করেন। তারা মিডিয়া কর্মী। সামাজিক দূরত্ব ধীরে ধীরে কমছে। হাঁচি-কাশি থেকে নির্গত ড্রপলেটে করোনা ভাইরাস থাকে। চিকিৎসা বিজ্ঞান দেখেছে একজন মানুষ থেকে আরেকজন মানুষ ছয়ফুট দূরে থাকলে হাঁচি-কাশি থেকে সংক্রমণের ঝুঁকি কম থাকে। একে ‘নিরাপদ দূরত্ব” বলে। সামাজিক অঙ্গণে চলাফেরার সময় এই নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখাতে হয় বলে এর নাম সামাজিক দূরত্ব। এর উপর খুব জোর দিয়েছে স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীরা। যাত্রীদের জন্য কাউন্টারে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

জোয়ারের পানি যখন উপচে মাঠে গড়ায়, তখন কোন এক নালা দিয়ে উচু ভিটা থেকে নিচের ভিটায় পানি পতিত হয়। এতে বুদবুদ ওঠে। বাতাসে এই বুদবুদ এলোমেলো ভাসতে থেকে। ভাসতে ভাসতে অনেকগুলো ছোটছোট বুদবুদ মিলে একটা বড় বুদবুদ তৈরি হয়। বাতাসের তোড়ে আবার তা মিলিয়ে যায়। সুজন লাইনে দাড়িয়ে সাংবাদিক, নেতাকর্মীদের ছোটাছুটি দেখছে। এসব দেখে নালা দিয়ে পানির পতন, বুদবুদ ওঠা, মিলিয়ে যাওয়া- ক্ষেতের আলে দাঁড়িয়ে উপভোগ করা শৈশবের সেই স্মৃতি মনে পড়ছে।

নেতা এসে ফিতা কাটলেন। এক সিট ফাঁকা, একসিটে যাত্রী – এই নিয়মে সাংবাদিক, নেতা, কর্মীরা
বাসে বসলেন। ছবি উঠলেন। নিউজ হয়ে গেলো।সবাই নেমে গেলেন। বাস ফাঁকা।

৪১ সিটের বাসে বিক্রয়যোগ্য সিট মোট ২০টি। ইতিমধ্যে যাত্রী উপস্থিত হয়েছেন ৫০ জন। কে পাবে কে পাবে না- সবার চোখেমুখে টেনশন। এর মধ্যে কানাকানি পড়ে গেল, একই পরিবারের একাধিক সদস্য থাকলে, তাদের আগে টিকিট দেয়া হচ্ছে। করোনা আইনে একই পরিবারের সদস্য হলে পাশাপাশি সিটে বসা যাবে।

একটি গোপন ‘বুদ্ধি’ গোপনে ছড়িয়ে পড়ল। হয়ত টিকিট কাউন্টার থেকেই ‘আগে টিকিট প্রাপ্তির’ এই গোপন মন্ত্র ছড়ানো হয়েছে। কে জানে! সবাই সবার আত্মীয়-স্বজন হতে শুরু করল।

চোখ, নাক, চুল, কিংবা কাপড় – যে যা দেখে, যে যাকে আস্থাভাজন মনে করেছে, তার সাথেই আত্মীয়তার বন্ধনে আবন্ধ হয়ে টিকিট সংগ্রহ করেছে। কেউ ভাই-ভাই, কেউ ভাই-দুলাভাই, কেউ ভাই-ভাবী। করোনা কত প্রতিষ্ঠিত নিয়ম এক ঝটকায় উড়িয়ে দিলো। আর “চলতি পথে অপরিচিত লোকের সাথে বন্ধুত্ব পাতাবেন না” বাসের ভিতরে তুলিতে লেখা এই ঠুনকো নিয়ম চুরমার হতে কতক্ষণ!

সুজন এক জনের সাথে “ভাই-ভাতিজা” সম্পর্ক স্থাপন করে দুটি টিকেট ম্যানেজ করেছে। লোকটা হাফহাতার চেক জামার সাথে ফরমাল প্যান্ট ইন করে পড়েছে। পায়ে বছর চারেকের পুরনো বাটার স্লিপার।

সুজনের বাবা অবসর প্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক। সারা জীবন এমন পোশাকেই স্কুলেও গিয়েছেন; আবার, শালার বিয়েতেও গিয়েছেন। আদর্শ জীবন যাপন করেছেন।
বাবার সাথে পোশাকের মিল আছে এই লোকটির। তাই এই অচেনা অজানা মুখের ভিরে এই মুখের চেয়ে প্রিয়মুখ নাই সুজনের কাছে।

ঢাকা-মাওয়া একপ্রেসওয়ে। পদ্মা সেতুর মহাসড়ক। সাই-সাই করে উড়ছে বাস। জৈষ্ঠের চরম গরমে বাসের জানালা থেকে আসা পরম বাতাসে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন চাচা। মাওয়া ঘাটের শোরগোলে ঘুম ভাঙে তার। সুজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে চাচা বললেন, “বাবা, আমার কপালে হাত দিয়ে দেখো তো একটু গরম কিনা।” এই করোনার কালে লুঙ্গি উঁচিয়ে খোসপাঁচড়া অন্যকে দেখানো যায়; জ্বর-কাশি নয়- হঠ্যাৎ কাঁচা ঘুম ভাঙায় তা চাচার মনে নাই হয়ত।

চাচার কপালে হাত ছোঁয়াতেই যেন সুজনের বুকের ভিতর ঝাঁকুনি দিলো। বিদ্যুতে স্পর্শ লাগলে যেমন কলিজায় ঝাঁকুনি লাগে, তেমন করে কেঁপে উঠল।
চাচার কপাল গরম। জ্বরজ্বর ভাব।

ভোর হতে যে ঝক্কি-ঝামেলা গিয়েছে তাতে এই বয়সে একটু কপাল গরম হতে পারে – এতো স্থির ভাবনা এখন মানুষের মাথায় আসে না। এই জরাতঙ্কের সময় জ্বরের রোগী এলে স্বয়ং ডাক্তার যেখানে চিংড়ি পোকার মতো ছটকা লাফে ছয়ফুট দূরে গিয়ে দাঁড়ায়, সেখানে সুজন শান্ত থাকে কী করে।

তবুও শান্ত থেকেই বাস থেকে নেমে পড়ে সুজন। বালুতে কিচ্ছুক্ষণ হাত ঘসে, কিন্তু মন তার শান্ত হয় না। বাসে ব্যাগে একটি হ্যান্ড স্যানিটাইজার থাকলেও ঐ বাসে ওঠা তার পক্ষে অসম্ভব। সে ঢাকা-বরগুনা রুটে লঞ্চের নিয়মিত যাত্রী। এম ভি শাহরুখ লঞ্চে লাল কালিতে লেখা একটি লাইন তার মনে পড়ে গেল – “সম্পদের চেয়ে জীবনের মূল্য বেশি।”

ফেরি ঘাট লোকে লোকে লোকারণ্য। আগে যখন এক ফুট দূরত্বে দাঁড়ানোর শর্তও ছিলো না, তখন রাতভর ফেরিঘাটে অপেক্ষায় থাকার অভিজ্ঞতা তার বহুবার হয়েছে।

সুজন ফেরিতে উঠছে আর নামছে। উঠছে আর নামছে। সারাদিন, সারারাত এই করে কাটিয়ে দিলো। ফেরির পর ফেরি যায়। ভিড় কমে না।
এক ফুটের পরিবর্তে ছয়ফুট দূরে দাড়াতে হবে- আইন হয়েছে। কিন্তু একটা ফেরির জায়গায় ছয়টা ফেরি চালু হয়নি। ভিড় কমবে কেমন করে! অথচ, একটা ফেরির জায়গায় ছয়টা ফেরি চালু করলে আইন চালু করা লাগত না। দুনিয়ায়, বোধহয়, আইন বানাতেই সবচেয়ে খরচ কম।

নির্ঘুম রাত পেরিয়ে সকালে তার আর ধৈর্য্য নাই। নিয়ম মানলে ছয়দিন-ছয়রাত ফেরিঘাটে থাকা লাগবে। কিন্তু ছয়দিনে তো আরো নতুন যাত্রী আসবে। সুজন মনস্থির করে এভাবেই যাবে। জাগতিক সব যুক্তি যখন হেরে যায়, তখন ধর্ম এসে মনোবল যোগায়। “যা থাকে কপালে” মনে মনে বিড়বিড় করে।

সবাই নিজের জীবনকে ভালোবাসে। পিঁপড়াও বিপদে পড়লে জীবন বাঁচাতে চেষ্টা করে। কিন্তু এদেশে তীব্র ঘনবসতি, দুর্বল অবকাঠামো, দারিদ্র্য, অশিক্ষা সব মিলে মানুষের সচেতনতা বোধ ধ্বংস করে দিয়েছে।

সকালে কস্তুরি ফেরি আসে। দ্রুত গতির জন্য সুনাম আছে এই ফেরির। সুজন তিনতলায় উঠে সামনে চলে যায়। মানুষে মানুষে মুখোমুখি অবস্থান স্বাস্থ্য সম্মত নয়। তাই সে একেবারে সামনে যেয়ে বাইরে মুখ করে দাড়ায়। প্রমত্তা পদ্মায় জেগে উঠছে সর্ববৃহৎ মানুষ্য স্থাপনা। আর বেশি দিন নয়। করোনার পরে যারা বেঁচে থাকবেন, সেই মানুষদের আর ঘুম ভাঙবে না মাওয়া ঘাটের শোরগোলে।

ইত্যাদি ভাবতে ভাবতে এক আনন্দ আবেশ ছড়িয়ে পরে তার চোখে-মুখে। এর মধ্যে চোখে পড়ে, দূরে ভেসে যাচ্ছে পদ্মা সেতুর একটি স্প্যান। মাছ শিকারী পাখি পানির সমান্তরালে যেমন উড়ে বেড়ায়, তেমন করে ভেসে যাচ্ছে। ত্রিশতম স্প্যানটি বসবে আজ। দক্ষিণ বাংলার মানুষের শত বছরের খণ্ডখণ্ড স্বপ্নগুলো জুড়ে দিচ্ছে পদ্মা সেতুর এক একটি স্প্যান। সুজনের চোখ বন্ধ হয়ে আসে। পদ্মার পবিত্র জল ছুঁয়ে আসা বাতাস বুক ভরে নেবে সে, তাই মাস্ক ছুড়ে ফেলে। কল্পনার ডানায় ভর করে সে ভ্রমণ করে আসে সেই আগামীতে, যেখানে পদ্মা সেতুর উপর দিয়ে সাই-সাই করে উড়ে যায় তার যান। পাখির ডানার মতো দুহাত মেলে দেয় সে। টাইটানিক জাহাজের মাস্তুলে দাড়িয়ে যেমন দুহাত ছড়িয়ে দিয়েছিলো নিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও।

“কোভিড-১৯ বিশেষ আইন, ২০২০” কার্যকর হয়েছে গতকাল। জনজীবন রক্ষার আইন। আইনের গুরুত্ব অনেক। সাংবাদিক পুলিশ প্রশাসন, জেলার হর্তাকর্তা ব্যক্তিরা মূল্যায়ন সভা বসিয়েছেন। কোথায় কী সংগতি-অসংগতি চোখে পড়েছে, সবই উঠে আসছে আলোচনায়। যাত্রীতে ঠাসাঠাসি একটা ফেরির ছবি প্রকাশিত হয়েছে অনলাইন পোর্টালে। ছবির একটা পয়েন্টে সবার ভ্রু কুচকে গেছে। এক যুবক সিনেমার নায়কের মত ফেরিতে দাড়িয়েছে। মহামারির সময়ে যা খুবই দৃষ্টিকটু।

চিনতে পেরে সুজনের বন্ধুরা স্রেফ খুশিতেই শেয়ার দিয়েছিলো প্রথমে। বন্ধুর বন্ধু, তার বন্ধু, এমনি করে ভাইরাল হয়ে যায় ছবিটি।

বাড়ির অনতিদূরে আসতেই সুজনের চোখে পড়ে রাস্তার মুখে মানুষের জটলা। মোবাইল কোর্ট বসেছে। ফেরিতে মাস্ক না থাকায় সুজনের ছয়মাসের জেল ও একলক্ষ টাকা জরিমানা হয়েছে।

নারিকেল-চিংড়ির ঝোল, আর চালের রুটি বানানোর সময় মা সুস্থই ছিলেন। হঠ্যাৎ তার বুকের ব্যথাটা বেড়েছে।

হাতকড়া পরা সুজন যাচ্ছে পুলিশ ভ্যানে। রাস্তার দুই পাশের শূন্য ফসলি জমি পানিতে থৈথৈ করছে। কার্লভাটের কাছে আসতেই দেখে পাঁচ-ছয়টা ছেলে একজায়গায় মাথা করে আছে। সুজনের বুঝতে দেরি হয় না, মোবাইল কোর্ট লাইভ করেছিলো সাংবাদিকেরা। ওরা সেখানে যুক্ত হয়েছে। এলাকার মুরুব্বীরা দোকানে জটলা করে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন আর “কোভিড-১৯ বিশেষ আইন, ২০২০” আইনের প্রত্যেকটা পয়েন্টের ভূয়সী প্রশংসা করছেন। কারন এই আইন যে কতটা কার্যকর তা তার স্বচক্ষেই দেখেছেন। এমনই আইনই তারা চেয়েছিলেন। আহ! আদা চায়ের অপূর্ব ফ্লেভার ছড়িয়ে পড়ছে রাস্তা অবধি। করোনায় আদা-চা বেশ উপাদেয়। চুমুক দিচ্ছেন। আইনটির কত জরুরি ছিলো তা বিশ্লেষণ করছেন। আবার, চুমুক দিচ্ছেন। তাদের এক কানে বাদুরের মতো ঝুলে আছে মাস্ক।

এমন সময় আদা-চায়ের মোহনীয় সুগন্ধ ভেদ করে চলে যায় পুলিশ ভ্যান। ভ্যানের ভিতরে “কোভিড-১৯ বিশেষ আইন ২০২০” এর শাস্তি প্রাপ্ত দেশের প্রথম বন্দি।

(এটি নিছক গল্প। বাস্তবের সাথে এর কোন মিল নাই)

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুণ :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এই বিভাগের আরও খবর :
© All rights reserved © 2020 The Daily Dipanchal
Customized By BlogTheme